IMG-20230102-WA0010

দুর্নীতির কাছে অসহায় যেন সু-নীতি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে একই কাজ দুই নামে টেন্ডার

Dhaka District
xfgd

মোঃ রাসেল সরকার/ নীতিতে বিশ্বাসীরা অসহায় হয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সক্ষমতা জোরদারকরন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো: এমদাদুল হক তালুকদারের কোটি কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুর্নীদি দমন কমিশনে অভিযোগ করেছে। আচমকা কোটিপতি এমদাদুল হক তালুকদার, কি নেই তার? বাড়ী, গাড়ি, ফ্ল্যাট, বিলাশবহুল জীবন-যাত্রা, সব কিছুতেই টুইটম্বুর। রূপকথার সেই আলাদিনের চেরাগে লুকিয়ে থাকা দ্বৈত্য এগুলো এনে দিতে পারলেও তিনি যেই বেতনে চাকুরী করেন তাতে এসব অর্জন খুবই দুস্কর। তবে তিনি প্রানীসম্পদ অধিদপ্তরে মিষ্টার টেনপার্সেন্ট এমদাদুল হক পদবীতেই বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে নিয়েছেন। টেনপার্সেন্ট কমিশনে প্রকল্পের আওতাধীন যেকোন টেন্ডার পছন্দের ঠিকাদারকে পাইয়ে দেন খবই সহজে। একাজে কেউ বাধা হলে তার ট্রান্সফার বান্দরবনে। আবার টেন্ডারের কোন কাজ না করেই পুরো বিল উঠিয়ে নেয়ার চিত্রও প্রকাশ পেয়েছে।
অভিযোগ সুত্রে জানা গেছে, মো: এমদাদুল হক তালুকদার প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে ৩য় গ্রেডের একজন কর্মকর্তা হয়েও পেয়ে গেছেন প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব। কাজের অভিজ্ঞতা না থাকায় ৩বসরে তার প্রকল্পে কাজের অগ্রগতি ৫শতাংশ। যদিও ছাত্র জীবনে কোন সময় ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন না। জাতীয় পাটির প্রভাবশালী নেতার পরিবারে বিবাহ করে জাতীয় পাটিকে সমর্থন দিয়েছেন সারা জীবন। তবে এই ৫শতাংশ কাজের মধ্যে মূলত তেমন কোন কাজ না করেই শুধুমাত্র কেনাকাটাতেই ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। অথচ প্রকল্পে কেনাকাটা করার নিয়ম হলো প্রকল্পের অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ শেষ হওয়ার পরের ধাপে। তিনি সেই নিয়মের তোয়াক্কা না করে এপিপি অনুযায়ী ২০কোটি ২৬লাখ ৫০ হাজার টাকার মালামাল ক্রয়ের জন্য দরপত্র আহব্বান করেন। যেখানে ৬৪টি জেলায় শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ স্থাপনের জন্য ১১কোটি ২০লাখ টাকা, বিভিন্ন দপ্তরে ফ্রিজ সরবরাহ করার জন্য ৩কোটি ৪০লাখ ৮০হাজার টাকা, বিভিন্ন দপ্তরে আসবাবপত্র সরবরাহের জন্য ৪কোটি ৬লাখ ৫০হাজার টাকা এবং বিভিন্ন দপ্তরে ডেক্সটপ কমপিউটার সরবরাহ ১কোটি ৫৯লাখ ২০হাজার টাকা টাকা অর্থাৎ সর্বমোট ২০কোটি ২৬লাখ ৫০ হাজার টাকার মালামাল ক্রয় সহ এর বাইরের অফিসের আসবাবপত্র, এসি, ফটোকপিয়ার কার্পেট, ল্যাপটপ ও বই-পুস্তিকা ইত্যাদি ক্রয়ের জন্য আরো ৫০লাখ টাকা খরচ করেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৬টি জেলায় শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ স্থাপনের জন্য ১০ফেব্রুয়ারী-২০২১ তারিখে দরপত্র আহব্বান করেন পরিচালক এমদাদুল হক তালুকদার। আর এই দরপত্র আহব্বানের পূর্বে ভোলা, মানিকগঞ্জ, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ জেলা অফিসের ৪টি শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের জন্য কোন দরপত্র ছাড়াই বিশেষ একটি প্রতিষ্ঠানের নিকট হতে সরবরাহ নিয়ে স্থাপন করেন। পরবর্তীতে ঐ বিশেষ প্রতিষ্ঠানের প্রদত্ত স্পেসিফিকেশন মোতাবেক দরপত্র আহব্বান করে কিছু অযাচিত শর্ত প্রদান করেন। শুধু পিডির নির্ধারিত ঠিকাদারকে কাজ দেয়ার লক্ষে শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ স্থাপনের জন্য জেনারেটর/বয়লার ইত্যাদি সরবরাহের অভিজ্ঞতাকে সংযুক্ত করা হয় ঐ দরপত্রে। কারন পিডি এমদাদুল হকের নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানের এধরনের কাজের কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। দরপত্রে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ঠিকাদার বাংলাদেশ সায়েন্স হাউস প্রতিটি শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের জন্যে ১০লাখ ৫০হাজার টাকা দরপ্রদান করেন। কিন্তু পিডির নির্দেশিত দরপত্র যাচাই-বাছাই কমিটি তাদেরকে ননরেসপনসিভ উল্লেখ করে সর্বোচ্চ দরদাতা মেসার্স জেনটেক ইন্টারন্যাশনালকে প্রতিটি শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের জন্য ১৪ লাখ ৬হাজার ২শ ৫৭ টাকায় কার্য্যাদেশ প্রদান করেন। এখানে প্রতিটি শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের জন্য ৩ লাখ ৫৬ হাজার ২শ ৫৭ টাকা হিসাবে ২৬টি জেলায় ৯২লাখ ৬২ হাজার ৭শ ২ টাকা অতিরিক্ত খরচ করেন।
ডিপিপিতে ১৫সিএফটি রেফ্রিজারেটর ক্রয়ের জন্য সংস্থান রয়েছে। আর আন্তর্জাতিকমানে ১৫ সিএফটি ৪২৮ লিটারের সমান। কিন্তু পিডি এমদাদুল হক ওয়ালটন কোম্পানিকে কাজ দেয়ার জন্য দরপত্রের স্পেসিফিকেশনে প্রথমে ১৫সিএফটি সমান ৩১৬লিটার উল্লেখ করে অন্যসব কিছু হুবুহু ওয়ালটনের ৩১৬লিটার ক্ষমতা সম্পন্ন রেফ্রিজারেটরের স্পেসিফিকেশন উল্লেখ করে দরপত্র আহব্বান করেন। কিন্তু ওয়ালটনের ১৫সিএফটি বা সমমানের কোন রেফ্রিজারেটর না থাকায় দরপত্র জমা দেয়ার কয়েকদিন আগে গোপনে টেন্ডারে সংশোধনীর মাধ্যমে ১৫সিএফটি শব্দটি বাদ দেন। ফলে জমাকৃত দরপত্র সমূহের মধ্যে ওয়ালটনের দরপত্র মূল্যায়নে পাশ করে। পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেয়ার উদ্দেশ্যে এই স্পেসিফিকেশন পরিবর্তনের কাজে টেন্ডার কমিটির সদস্যরাও ছিলেন। সরকারী নিয়ম অনুযায়ী ডিপিপির ব্যতয় ঘটিয়ে কোন কাজ করা পিডির জন্য বৈধ না হলেও তিনি কোন আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে নিজে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য এ ধরনের অনিয়ম করেন। তাছাড়া অধিকাংশ দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে সরবরাহকৃত রেফ্রিজারেটর গুলো অকোজো অবস্থায় পড়ে আছে। যা সরোজমিনে পরীক্ষা করলে অভিযোগটি প্রমানিত হবে।

এছাড়া পিডি এমদাদুল হক অফিসের যেই রুক্ষে বসে কার্য পরিচালনা করেন সেই কক্ষটির আসবাবপত্র ভবন নির্মানকারী ঠিকাদার দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী সরবরাহ করেছিলেন। কিন্তু পিডি তার পরেও আসবাবপত্র ক্রয় দেখিয়ে ১০লক্ষ টাকা, দেড় লাখ টাকা মুল্যের ১টি ফটোকপিয়ার মেশিনের দাম ৪লক্ষ টাকা, কোন বইপত্র ক্রয় না করেই লাইব্রেরীর বই কেনা দেখিয়ে ৭লাখ ৩৪ হাজার টাকা , বিভিন্ন সম্মানী বাবদ ৭ লক্ষ টাকা, ১লাখ ২০ হাজার টাকা মুল্যের ১টি ২টন এসি দাম ৪ লক্ষ টাকা দেখিয়ে, গাড়ীর জ্বালানী ক্রয় বাবদ ৫লক্ষ টাকা এবং মেরামত বাবদ ১ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেন। যা মন্ত্রনালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি দ্বারা তদন্ত করলেই এর সত্যতা বেরিয়ে আসবে।
অপরদিকে পিডি এমদাদুল হকের অধীনে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভেটিরিনারী পাবলিক হেলথ সার্ভিস জোরদারকরন প্রকল্পের কাজেও লুটপাটের একই চিত্র ফুটে উঠেছে। এবিষয়েও দুর্নীতি দমন কমিশন সহ মৎস্য ও প্রানী সম্পদ প্রতিমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম এমপি বরাবর অভিযোগ কোর প্রতিকার মেলেনি। এই প্রকল্পের আওতায় ইটিপি অর্থাৎ ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য ২ডিসেম্বর-২০২১ তারিখে অভিজ্ঞতার বিশেষ শর্ত দিয়ে মোট ১কোটি ৭০লাখ টাকার দরপত্র আহব্বান করেন। এই দরপত্রে মাত্র ১টি প্রতিষ্ঠান অংশ গ্রহন করেন। বিশেষ শর্ত অনুযায়ী উক্ত প্রতিষ্ঠানটির অভিজ্ঞতা সঠিক না থাকার পরেও কোন প্রকার যাচাই বাছাই ছাড়া তাকেই কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। অভিজ্ঞতা নামক বিশেষ শর্তটি না দিলে উক্ত টেন্ডারে আরো একাধিক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সিডিউল জমা দিতো। আর এতে কাজটির খরচ হতো সর্বসাকুল্যে ৫০ লাখ টাকা। তার পরেও উক্ত কার্য্যাদেশ প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান সিডিউল মোতাবেক কাজ না করে ৯৫ শতাংশ বিল উত্তোলন করে নিয়ে যায়। এ প্রকল্পের আওতায় অভ্যন্তরীন রাস্তা নির্মানের জন্য ৫অক্টেবর-২১ তারিখে মোট ৩০ লাখ টাকার দরপত্র আহব্বান করা হয়। দরপত্রের আই ডি নং -৬০৮৬৫৭ এবং কাশবন এন্টারপ্রাইজকে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। উক্ত প্রতিষ্ঠান ৬ইঞ্চি ঢালাইয়ের পরিবর্তে ৪ইঞ্চি ঢালাই দিয়ে বিল উঠিয়ে নেয়। কিন্তু ঐএকই রাস্তাটির সাথে বঙ্গবন্ধুর একটি মুর‌্যাল উল্লেখ করে ২৩অক্টেবর-২২ তারিখে পুনরায় ৫৫লাখ ২৩হাজার টাকায় টেন্ডার আহ্বান করেন। উক্ত টেন্ডার আইডি নং-৭৪৪৫৬৪। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় মন্ত্রীর দপ্তরে প্রকল্পের অধীনে বাউন্ডারী ওয়াল নির্মানের জন্য ৭ডিসেম্বর-২০২০তারিখে দরপত্র আহব্বান করে মেসার্স রাফিদ এন্টারপ্রাইজকে ২৭জানুয়ারী-২০২১ তারিখে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। রাফিদ এন্টারপ্রাইজ যথাসময়ে কাজ শেষ করে চুড়ান্ত বিল নিয়ে যায়। কিন্তু পিডি একই কাজসহ সাথে গেইট ও গার্ডরুমের জন্য ৩ অক্টেবর-২০২২ তারিখে মোট ৭২ লাখ ৮০ হাজার টাকায় পুনরায় টেন্ডার আহব্বান করে।
প্রকল্পের সংশোধিত অংশে এইচভিএসি, ক্লিন রুম প্যানেল,এক্সপক্সিপেইন্ট, ল্যাব ফার্নিচার, রিফ্লেক্টিং গ্ল্যাস এন্ড কার্টেন ওয়াল, ভিপিএইচ কনফারেন্স ইত্যাদি করার জন্য ২০ অক্টেবর-২০২২ তারিখে মোট ৭কোটি ৯৮ লাখ ৪৫ হাজার ৪শ টাকার দরপত্র আহব্বান করা হয়েছে। কিন্তু ঐ সকল কাজের মধ্যে আসবাবপত্র, গ্ল্যাস, সভাকক্ষ, শীতাতাপ নিয়ন্ত্রন যন্ত্র ইত্যাদি মূল ভবন নির্মানের অংশ হিসাবে ঠিকাদার ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। যা সরেজমিনে তদন্ত করলে প্রমানিত হবে। এক্ষেত্রে নূতনভাবে যেসব কাজ করা প্রয়োজন সেগুলো করতে কোটি টাকার মতো খরচ হবে। এ প্রকল্পের আওতায় পূর্বে যে সকল ইকুইপমেন্ট ক্রয় করে বিল পরিশোধ করেছে তা সরেজমিনে পরীক্ষা করলে খুজে পাওয়া যাবে না।
সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়, জবাবদিহিতা না থাকায় বর্তমানে একটি টেন্ডারের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ টাকা বিভিন্ন হারে কমিশন কেটে নেয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অবশিষ্ট ৩০শতাংশ টাকা নামে মাত্র কাজ করার সুযোগ পায় ঠিকাদাররা। প্রকল্পের নথিপত্র পর্যবেক্ষণ করলে নিয়মবর্হিভুত কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে ঠিকই তবে এক টাকা কমবেশী হয়েছে এমন হিসাবের চিত্র খুজে পাওয়া যাবেনা। কারন টেনপার্সেন্ট কমিশন ঠিকাদারের হাত ঘুরে কর্মকর্তার পকেটে চলে আসে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *